শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাম আল্লাহর ‘নবী’ হতে পারেন : মুফতি হারুন ইজহার

| প্রকাশিতঃ ১১ নভেম্বর ২০২০ | ১:০০ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম : হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও দেবতা রাম- আল্লাহর ‘নবী’ হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মুফতি হারুন ইজাহার।

আজ মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ের একটি হোটেলে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে জাগো হিন্দু পরিষদের মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

সভায় মুফতি হারুন ইজাহার বলেন, আমরা চাই আমাদের এই পারস্পরিক সম্পর্কটা জাস্ট সৌজন্যতাবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটা সাসটেইনেবল অবস্থায় পৌঁছুক। আমি গোড়া থেকে শুরু করলে জিনিসগুলো আরও ক্লিয়ার হবে। আমরা যখন ইসলামী ধারায় বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করি। তখন আমাদেরকে প্রথম পড়ানো হতো আকিদা বা বিশ্বাস, ধর্ম সংক্রান্ত মৌলিক বিশ্বাসগুলো।

তিনি বলেন, হিন্দুধর্মাবলম্বীদের দেবতা রাম আল্লাহর নবী হতে পারেন, আবার না-ও হতে পারেন। আমাদের নবীজি বলেছেন, আমার আগে হাজার বছরে লক্ষ নবী এসেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় আমি। সে হিসেবে লক্ষ নবীর মধ্যে রামও একজন হতে পারেন। কৃষ্ণও একজন হতে পারেন।

মুফতি হারুন ইজাহার বলেন, বেদ (হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ) সম্পর্কে বলা আছে, এটা সেম টু কোরআন। আসমান থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেজন্য কটূক্তি দূরের কথা, উনাদের (রাম, কৃষ্ণ) নিয়ে শুধু সমালোচনা না, অস্বীকার করাও যাবে না। ওনারা আমাদের নয়- এটাও বলা যাবে না। হতে পারে, আমাদের নবীজীর মতো তারা ‘প্রফেট’ ছিলেন। কোরআনে উল্লেখ আছে, কিছু নবীর নাম আমি উল্লেখ করেছি, কিছু নবীর নাম উল্লেখ করিনি। যেহেতু বহু নবীর নাম কোরআনে উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ না করাদের মধ্যে উনারাও থাকতে পারেন। জাকির নায়েকের অনেক লেকচার আছে। সেখানে তিনি বেদ ও হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ইসলামের সমন্বয়ের জায়গাগুলো প্রমাণ করেছেন।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে দাবি করে হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজাহার জানান, বাঁশখালীতে তার বাড়ির পাশে সব হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বাড়ি, এমনকি একজন হিন্দুধর্মাবলম্বী চিকিৎসক তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা করেন।

হারুন ইজাহার বলেন, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায় তৃতীয় পক্ষ। তারা হলেন ‘নাস্তিক’। এই তৃতীয় পক্ষটা রাজনীতি করছে হিন্দুদেরকে নিয়ে। দুর্গাপূজাতে হিন্দুরা যেভাবে সমবেত হয়, রাজনীতিতে গিয়ে হিন্দুরা সেভাবে সাড়া দেয় না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ অনেক উগ্র বক্তব্য দিয়ে থাকে। যেমন এই সংগঠনের নামটাই আমরা সাম্প্রদায়িক মনে করি। এখানে মুসলমানদের নাম নেই কিন্তু। শুধু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আছে।

এ সময় জাগো হিন্দু পরিষদের উপদেষ্টা মিলন শর্মা বলে উঠেন, বঙ্গভাষী মহাসভা- এটাতে হিন্দু, মুসলিম সমন্বয় আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ সংগঠনের কাজ আছে। বাংলাদেশে আমি এটা নিয়ে আসবো। আসলে অনেক কিছু দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমি পরিস্কার হয়ে গেছি, আপনারা আমাদের কত আপন!

মিলন শর্মা আরও বলেন, রাউজানে সালাউদ্দিন কাদের ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়ির পেছনে আমার বাড়ি। আমার এলাকায় অমি একটা মসজিদ করে দিয়েছি, আমার অর্থায়নে, মৌলভী কবির আহমদের বাড়িতে। এরকম একটা সম্পর্ক আমাদের।

গত ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সমাবেশে হেফাজতসহ ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান প্রসঙ্গে মিলন শর্মা বলেন, এই স্লোগান যখন আমি ভিডিওতে দেখেছি, তখন সাথে সাথে আমি সবাইকে নক করেছি, এরা কারা? এদেরকে বের করো। এদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর সাহস না পায়, এ সমস্ত অপকর্ম করার, আপত্তিকর স্লোগান দেয়ার, একটা সম্প্রতি নষ্ট করার। এটার জন্য আমরা কেন্দ্রের কাছে গিয়েছি, কেন্দ্র যথেষ্ট প্লিজড হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরাও অনেকটা অন্ধকারে ছিলাম, ভুল বোঝাবুঝি ছিল, হেফাজত মুসলিমদের সংগঠন। কিন্তু না, এটা আদর্শিক সংগঠন। আপনাদের মধ্যে আদর্শ আছে। গতকাল (ঢাকায় ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের সাথে বৈঠকে) আমি শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। যারা আপত্তিকর স্লোগান দিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আমরাও চাই।

মিলন শর্মা বলেন, বড় বড় অনেক নেতা আছে আমাদের, যারা ধর্মকে পুঁজি করে, ক্ষমতা ব্যবহার করে। তাদের কারও এক পা বাংলাদেশে, এক পা ইন্ডিয়াতে- জাগো হিন্দু পরিষদে এরকম কেউ নেই। আমরা এ দেশকে ভালোবাসি। এ দেশের মাটি ও মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকবো। জন্ম এ দেশে, শিক্ষা ও কর্মস্থান এখানে, মৃত্যুও হবে এখানে। আমরা ওখানে কেন যাবো? এটার বিরোধী আমরা।

সভায় বক্তারা কোনো ধর্মীয় সংঘাতে না গিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সম্প্রীতির মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান। ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট আলোচনার মাধ্যমে সমাধান ও কারো প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ পরিহারে একমত পোষণ করেন।

জাগো হিন্দু পরিষদের নেতারা জানান, হেফাজতসহ ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে যে স্লোগান দিয়েছে তাতে আমাদের সংগঠন একমত নয়। তারা জাগো হিন্দু পরিষদের ব্যানার ব্যবহার করে অপকর্ম করেছে। দুই বছর আগে সংগঠন থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান হিন্দু নেতারা।

সভায় অন্যান্যদের মধ্যে কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের সভাপতি মাওলানা আলী ওসমান, শিক্ষাবিদ ড. আ ফ ম খালেদ হোসেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম ও জাগো হিন্দু পরিষদের সভাপতি রুবেল কান্তি, সহ সভাপতি তপন দাশ, দেবু সরকার ও নিতাই দেবনাথ প্রমুখ বক্তব্য দেন।