শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হাইকোর্টের আদেশ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের চেয়ে নাদের খানের ‘জেদটাই’ বড়!

প্রকাশিতঃ শনিবার, নভেম্বর ১৪, ২০২০, ৩:১২ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : গো ধরে বসে আছেন সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান, শিল্পপতি নাদের খান। সংকট সমাধানে কোনোভাবেই নমনীয় হচ্ছেন না তিনি। অভিভাবক ফোরাম, চসিক প্রশাসক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) পরিচালক কারো অনুরোধই রাখলেন না। বরং করোনা পরিস্থিতিতেই শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনড় থেকে অভিভাবকদের ‘ইডিয়ট’ বলতে দ্বিধা করেননি তিনি।

আইন বহির্ভূতভাবে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের বৃদ্ধি করা টিউশন ফি পরিশোধ করতে না পারা শিক্ষার্থীদের গত ১১ অক্টোবর থেকে নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণে বিরত রাখে স্কুল কর্তৃপক্ষ। আর এই ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনে ওঠেছে সমালোচনার ঝড়।

ক্লাসবঞ্চিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক, অভিভাবক ফোরাম, চসিক প্রশাসক এবং মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক বেশ কয়েকবার সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানের কাছে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করা এবং অভিভাবকদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার অনুরোধ করেন।

কিন্তু কারো অনুরোধের তোয়াক্কা না করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন নাদের খান। ফলে ‘করোনার মাঝেও বাড়তি ফি, অনাদায়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবঞ্চিত করছে সাইডার! শিরোনামে গত ১৭ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করে একুশে পত্রিকা।

তখন অভিভাবকদের “ইডিয়ট” সম্মোধন করে একুশে পত্রিকাকে সাইডার স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খান বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি স্কুল বন্ধ করে দেবেন, তারপরও টিউশন ফি পরিশোধ করতে না পারা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ও নিয়মিত ক্লাশে অংশগ্রহণের সুযোগ দেবেন না।

এ পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ফোরামের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আফরােজা আক্তার উচ্চ আদালতে একট রিট পিটিশন (৭৫১৭/২০২০) দায়ের করেন।

গত ৩ নভেম্বর রিটের উপর অনুষ্ঠিত শুনানির পর  মহামান্য হাইকোর্ট বহিষ্কার করা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে প্রবেশের জন্য কেন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, আইন অনুসারে টিউশন ফি কেন পুনর্নির্ধারণ করা হবে না এবং স্কুলে একটি নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটি কেন গঠন করা হবে না-জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের দ্বৈত বেঞ্চ আদেশের ১৫ দিনের মধ্যে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাসবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মাউশি পরিচালককে নির্দেশ দেন।

এদিকে, হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশনাসহ একটি চিঠি গত বুধবার (১১ নভেম্বর) সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল জে. সি. ত্রিপাঠির কাছে ইমেইল ও ডাকযোগে পাঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. গাজী গােলাম মাওলা।

পাশাপাশি স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানকে ফোন করে উচ্চ আদালতের আদেশ অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য অনুরােধ করেন মাউশি পরিচালক। কিন্তু নাদের খান হাইকোর্টের আদেশকে পাত্তাই দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ ওঠেছে।

এদিকে, ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল-এর অর্ধ-বার্ষিকী পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামীকাল (রবিবার) থেকে। কিন্তু বাড়তি ফি পরিশোধে অক্ষম শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস থেকে বিতাড়িত করার পাশাপাশি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।

সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আফরােজা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নিজের ইগোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নাদের খান মহামান্য আদালতের নির্দেশ তো অমান্য করছেনই, এর পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।’

তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (রবিবার) স্কুলের অর্ধ-বার্ষিকী পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও ক্লাসবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা বারবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুরোধ জানালেও স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছুই জানায়নি। কতটা ক্ষমতা থাকলে একজন ব্যক্তি দেশের আইনকে এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারেন? প্রশ্ন রাখেন ব্যারিস্টার আফরোজা।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. গাজী গােলাম মাওলা একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি স্কুলের প্রিন্সিপালকে বিষয়টি জানিয়ে আদালতের রিট অনুযায়ী অতিদ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে চেয়ারম্যান নাদের খানের সাথেও কথা বলে এই বিষয়ে অবগত করেছি। এক্ষেত্রে আমাকে তিন কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হবে, তারপর আমি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবো।

সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়মানুযায়ীই হবে সবকিছু। এজন্য যে-ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা আমরা নেবো। গত ১৭ অক্টোবর একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পছন্দ হয়নি জানিয়ে নাদের খান বলেন, আপনার (প্রতিবেদক) সাথে এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। আপনি যা ইচ্ছে লিখে দিন, বলেই ফোনের লাইন কেটে দেন নাদের খান।