শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

তোমাকে উপড়ে নিলে বলো কী থাকে আমার

প্রকাশিতঃ রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ৩:৩০ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী :

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত। – আল মাহমুদ

মায়ের ভাষার জন্য লড়াই করে প্রাণ দেওয়া জাতি আমরা। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল। সে কারণে শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। একটা সময় ছিল যখন শহীদ মিনারের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। কেউবা ২১ ফ্রেব্রুয়ারি এলে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানাতেন। মূল কথা শ্রদ্ধা নিবেদনটাই বড়কথা।

এখন সরকার শহীন মিনার গড়ে দিচ্ছেন। ব্যক্তি বা সামষ্টিক উদ্যোগেও গড়ে উঠছে শহীদ মিনার। এসবই ভরসার জায়গা। চেতনার জায়গা। কিন্তু প্রথম যারা একুশের চেতনাকে জাগরুক করেছিলেন তাদেরকে যেন আমরা কখনো না ভুলি। যেমনি ভুলতে পারি না ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি। এই কলামে এবার তুলে ধরবো ভাষা আন্দোলনের প্রথম যা কিছু তা। একুশের প্রথম ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ। মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইরের পারিল গ্রামে বাড়ি। সে সময় শহীদ রফিকের বয়স ২৬ বছর। ১৯৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক অংশ নেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলি লাগে রফিকউদ্দিনের মাথায়। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

একুশের প্রথম শহীদ মিনার হয়েছিলো রাজশাহীতে। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়রি পরিকল্পনা এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাসের পাশে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাইদ হায়দার। এই মিনারটি উদ্বোধন করেন ভাষাশহীদ সফিউর রহমানের বাবা মৌলভী মাহাবুবুর রহমান। কিন্তু পরে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী এই মিনারটি ভেঙে ফেলে। ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাক হোস্টেলের ১২ নম্বর গেইটের সামনে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সম্মিলিত শ্রমে নির্মিত হয়েছিল। এর নকশাকার ছিলেন ডা. বদরুল আলম। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ দিবস এই দিনে প্রথমবারের মতো পালন করা হয় শহীদ দিবস। দীর্ঘ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় সেদিন। শোভাযাত্রীরা শোকজ্ঞাপক কালোব্যাজ, কালো পতাকা ধারণ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে অগ্রসর হতে থাকে। সেবারই প্রথম পালন হয় শহীদ দিবস।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম লিফলেট প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি বর্ষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। গুলি বর্ষণের অল্প কিছুক্ষণ পরই হাসান হাফিজুর রহমান, আমীর আলীসহ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টোদিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যান। সেখানে গিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটের খসড়া তৈরি করেন। দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই লিফলেটটি ছাপার কাজ শেষ হয়। হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসেন। প্রায় দুই-তিন হাজার লিফলেট ছাপানো হয়েছিল। উৎসাহী ছাত্ররাই এ লিফলেটগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। আশেপাশের সমগ্র এলাকায় পৌঁছে যায় লিফলেটগুলো। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে প্রথম কবিতা রচনা করেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। নাম ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’।

পাকিস্তান সরকার সে কবিতা বাজেয়াপ্ত করে। হুলিয়া জারি হলো মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ওপর। তিনি এবং তাঁর কবিতা হয়ে গেল ইতিহাসের অংশ। ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’- একুশের প্রথম কবিতা। একুশের গান হিসেবে অধিক সমাদৃত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি। তবে এটি একুশের প্রথম গান নয়। ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম গানটির প্রথম চরণ ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’। যার রচয়িতা ভাষা সৈনিক আ ন ম গাজিউল হক। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আর্মানিটোলা ময়দানের জনসভায় গানটি গাওয়া হয়। ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা হত্যার পর রচিত একুশের প্রথম গল্পের নাম ‘মৌন নয়ন’। গল্পটির রচয়িতা কথাশিল্পী শওকত ওসমান। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ গ্রন্থে গল্পটি প্রথম প্রকাশ হয়। ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে একুশের প্রথম সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম কৃতি পুরুষ কবি হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকাশক ছিলেন অন্যতম ভাষাসৈনিক মুহাম্মদ সুলতান। পুঁথিপত্র প্রকাশনার মাধ্যমে প্রকাশিত এই সংকলনের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আমিনুল ইসলাম। রেখাচিত্র এঁকেছিলেন মর্তুজা বশীর। সংকলনটি পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষ ছাপা হয়। এই সংকলনে স্থান পেয়েছিল একুশের প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, গান, নকশা ও ইতিহাস। মুনির চৌধুরী এবং তার রচিত নাটক ‘কবর’ এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বিরল।

ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ ৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন মুনির চৌধুরী, রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেক লেখক-সাংবাদিক। মুনীর চৌধুরী ’৫৩ সালে জেলে বসেই কবর নাটকটি রচনা করেন। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি, রাত ১০টায় জেলকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর হ্যারিকেনের আলো-আঁধারিতে মঞ্চস্থ হয় কবর। একুশের প্রথম উপন্যাস জহির রায়হান রচিত ‘আরেক ফাল্গুন’। শহীদ দিবস পালন, শহীদ মিনার নির্মাণ ভাষা আন্দোলনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয় এই উপন্যাসে। ৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার মাত্র তিন মাস পর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে রচিত হয় এই উপন্যাসটি।

একুশের চেতনা নিয়ে প্রথম নির্মিত সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে জহির রায়হান সিনেমাটি পরিচালনা করেন। সিনেমাটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে সিনেমাটি। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘের ১৮৮টি দেশ একসঙ্গে প্রথম ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। এর আগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রস্তাবটির খসড়া পেশ করে। বাংলাদেশকে সমর্থন জানায় ২৭টি দেশ।

এই যে সৃষ্টি, কতোটা অন্তঃপ্রাণ থাকলে মানুষ ভাষার জন্য লড়তে পারে সেটি উপলব্দি না করলে বোঝা মুশকিল। সে কারণে বলা হয়, অমর একুশে আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। তাই এই গর্বের বর্ণমালার এতটুকু অবমাননাও সহ্য করা যায় না। কবি শামসুর রাহমান তাই বলে ফেলেন, ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার? ঊনিশশো’ বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি/বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী’।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক