শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

খালিদ ভাই, এভাবে কি কেউ যায়?

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ২২, ২০২১, ৫:২২ অপরাহ্ণ

আবু মুসা চৌধুরী : খালিদ আহসান ছিলেন কলেজেটিয়ান। আমার দু’বছরের সিনিয়র। আমি ডাকতাম খালিদ ভাই। তখন আমি ক্লাস এইটে। মাসুদ রানার পাগল পাঠক। কারেন্টে বইপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে ছোট্ট একটা পকেট সাইজ পত্রিকা চোখ কেড়ে নেয়। পত্রিকার নাম ‘ওই নূতনের কেতন ওড়ে’। নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে বেরিয়েছে। নিউজপ্রিন্টে ছাপা। মলাটের রং হালকা লাল। অদ্ভুত রুচিস্নিগ্ধ পরিশীলিত সম্পাদনা। পেছনের মলাটে আন্দরকিল্লায় অবস্থিত ‘হাশেম মেডিক্যাল সেন্টার’-এর বিজ্ঞাপন।

খালিদ ভাই ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হাশেম-এর দৌহিত্র। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাসা ছিলো দেওয়ানহাটের মোড়ে চিকিৎসক পিতার দোতলা কোয়ার্টারে।

খালিদ ভাই আমাদের চেয়ে একটু বেশিই পাকা ছিলেন (অকালপক্ক?)। সেই কৈশোরে সিগ্রেট ফুঁকছেন একটির পর একটি। কাঁধছোয়া দীর্ঘ চুল। ছিপছিপে ক্ষুরের মতো ধারালো শরীরে সমস্ত গেসচার- পোসচারে স্মার্ট ও আধুনিক। সমস্ত অভিব্যক্তি, পোশাক-আশাক থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসছে সূক্ষ্মরুচি-প্রমা ও লাবণ্যের ঝলক।

দেওয়ানহাটের সেই বাসার চারপাশের দেয়ালজুড়ে কাঠের আলমারি ও সেলফজুড়ে থরে বিথরে সাজানো বই। বই আর বই। টেবিলের ঢাউশ স্ট্রে উপচে পড়ছে সিগ্রেটের ফিল্টার। তখন আমাদের ছাত্রজীবন। সবচেয়ে দামী সিগারেট লন্ডন ফাইভ পছন্দ করলেও, আমজনতার প্রিয় প্রেমের মতো নীল প্যাকেটের স্টারই ফুঁকছি একটার পর একটা।

তখন লিখতাম ছড়া। বলছি স্বাধীনতার পর পর ’৭২-’৭৩ সালের কথা। আমি ও আমার বন্ধুরা মেতে আছি ছড়া নিয়ে। বাংলাদেশের সমস্ত প্রথম শ্রেণির পত্রিকা ও সাময়িকীতে হররোজ ছাপা হচ্ছে আমাদের ছড়া। আমরা মানে কিছুটা বয়োজ্যেষ্ঠ শাহাবুদ্দীন নাগরী, জাকির হোসেন বুলবুল (গল্পকার), অজয় দাশগুপ্ত, সনজীব বড়ুয়া, খালিদ আহসান, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ওমর কায়সার, শামসুদ্দীন হারুন, দীপক বড়ুয়া, বিপুল বড়ুয়া, আইউব সৈয়দ, মঈনুদ্দীন মঈনু এবং আরো কেউ কেউ।

বখতেয়ার হোসেন সম্পাদিত ছোটদের পত্রিকা খেলনায় বেরিয়েছে খালিদ ভাইয়ের সেই অসাধারণ ছড়াটি- ‘ওখানে কে রাজপুত্তুর?/ওখানে কে?/নয় কো লাট?/ ওখানে কে?/ শ্রেণিশত্তুর মুণ্ডুকাট।’ আর খন্দকার আকতার আহমদ সম্পাদিত ছড়া সাম্প্রতিক লিটল ম্যাগাজিনে বেরুনো খালিদ ভাইয়ের ছড়াটি তো তখন ছিলো আমাদের মুখে মুখে।

প্রেমের তরী ছিঁড়তে হলে
ঠোঁটের উপর ঠোঁট রেখে গা
রবি ঠাকুরের গান।
এই কথাটি বলছি শালা
খালিদ আহসান।

চন্দনপুরার ছুরুতিয়া প্রেস থেকে ছাপা হতো ক্রাউন সাইজের পত্রিকা ‘প্রতিভাস’। ওখানে বেরুনো খালিদ ভাইয়ের গল্প-থিমটা এরকম- সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণের উদ্ভিন্ন যৌবনা বন্ধুর মায়ের প্রতি শরীরী আকর্ষণ ও এতদ্ সম্পর্কিত মিথস্ক্রিয়া। আর একটি গল্প লিখেছিলেন খালিদ ভাই। সাফায়াত খান সম্পাদিত ‘হারিয়ে যেতে নেই মানা’ শীর্ষক পত্রিকায়। সদ্য কামজ উপলব্ধিজাত বিক্রিয়ায় এক তরুণের ছপ ছপ করে প্যান্ট বেয়ে নেমে আসা পেচ্ছাপের তোড় ও তার আত্মোপলব্ধি।

খালিদ আহসানের আর একটি গল্প বেরিয়েছিল ‘স্পার্ক জেনারেশন’-এর একটি সংখ্যায়। গল্পের নায়ক এক নিরালা দুপুরে এক অপকর্ম করার বর্ণনা দেয়। ওটা ছিলো বোধহয় এরকম- ‘আজ দুপুরে আমি একটি কাণ্ড করে ফেললাম। বাথরুমে। নায়িকা ছিলো নীতু সিং। মাস্টারভেশন-এর এতো শিল্পীত প্রকাশ- আমার মতো সমস্ত বাংলাসাহিত্য ঘাঁটা ঘাঘু পাঠকও পায়নি। ভাবুন তো একবার!

বার বার বলতাম খালিদ ভাইকে একটি গল্পসঙ্কলন প্রকাশ করার জন্যে। কিন্তু এরকম নির্বিকার, উদাসীন, অনাগ্রহী আমার ইহজমে আর দ্বিতীয়টি দেখিনি।

’৭৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টার পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম ইংরেজি ও সমাজতত্ত্বেও। যদিও ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সুপ্ত বাসনা ছিলো মনজুড়ে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনভাবে বাংলা বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে গেলাম। পিতৃদেবকে জানানোর পর বললেন, বাংলায় পড়ে কী হবে? ভাত পাবি না। আমি হুমায়ূন স্যার মানে ড. রাজীব হুমায়ূন স্যারের শিখিয়ে দেয়া বচনামৃত আওড়িয়ে আমার মহান পিতাকে আমাবিষয়ক হতাশা থেকে মুুক্তি দিলাম। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বালমার্কা বিভাগ বাংলায় ভর্তি হয়ে অথর্ব, অযোগ্য, অশিক্ষিত অধ্যাপকদের খপ্পরে পড়লাম।

আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন। চেহারা তার নাদুস-নুদুস, মদনমার্কা আস্ত একটা গবেট বলা যায় তাকে এবং ওই হালাকে আমার সবসময় ‘প্রমোদবালক’ মনে হতো। তিনি বিভূতিভূষণ পড়াতেন। এ সম্পর্কীয় তার গবেষণাগ্রন্থ বেরিয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে। একদিন ক্লাসে বললেন- পথের পাঁচালী, অপরাজিত সিক্যুয়েল তারাদাস বন্দোপাধ্যায় লিখিত ‘কাজল’ এখনো তার চোখে পড়েনি। আমি দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘ক্যানো স্যার, গতকালই তো নিউমার্কেটের নিউজফ্রন্ট থেকে আমি ওই বই কিনেছি। বুঝুন ঠ্যালা! তাদের দৌড়।

এমত বাস্তবতায় তখন বাংলাবিভাগ আলোকিত করছেন ড. আনিসুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর, তারেক স্যারের মতো মহান শিক্ষক কাজলেন্দু দে, হোসেন ফিরোজ, আসাদ মান্নান, খালিদ আহসান, সনজীব বড়ুয়া, শামীম লুৎফার-এর মতো দেশবরেণ্য কবিবৃন্দ।

তখন খালিদ ভাই বার করেছিলেন অনন্যসাধারণ ফোল্ডার ‘চোখ’। সাদা-কালো। রিভার্সে ছাপা। অনেক অনেকদিন খালিদ ভাইয়ের সেই আদ্র চোখ আমাকে তাড়া করে ফিরেছিলো। আর মজার ব্যাপার মুক্তধারা আয়োজিত সেই বছরের একুশের সঙ্কলন প্রতিযোগিতায় সেই বছরের সেরা পুরস্কার জিতে নিয়েছিলো খালিদ আহসানের সেই ‘চোখ’।

ওমা, এতো পুরস্কার-টুরস্কার জাতীয়ভিত্তিক খ্যাতির পরও আমাদের খালিদ ভাই পর্বতপ্রমাণ বিরক্তি ও শিল্পতৃষ্ণায় এই শহরে আলবেয়ার ক্যাম’র কথিত আউটসাইডার-এর মতো ইতিউতি ঘুরপাক খাচ্ছেন। অনন্ত শিল্পক্ষুধা, ক্ষুরের মতো ধারালো সূক্ষ্ম রুচি, অতলান্ত ‘ধী’ সহযোগে এক ‘অসম্ভবের পায়ে’ যেন ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে নিজের ভেতরেই সেঁধিয়ে রয়েছেন। হ্যাঁ. খালিদ ভাই ছিলেন অন্তর্মুখি।

তার গুণকীর্তন প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। আমাদের এই পোড়া শহরের সৌভাগ্য খালিদ আহসানের মতো এমন একজন কৃতীজন এই শহরে একদিন ছিলেন। এখন নাই হয়ে গেছেন।

অরিন্দমের নাটক ঢাকা থিয়েটারের ‘শকুন্তলা’- খালিদ আহসান অজন্তা ইলোরার নগ্নিকার ভাস্কর্যের মোটিভ ব্যবহার করে, যে ব্রোশিয়ার করেছিলেন তার পাশে দাঁড়াতে পারে আর কোন্ নাটকের কোন্ প্রকাশনা?

‘স্পর্শ’ বার করবো। নিজের টাকায় লোগো ব্লক করে এনে দিলেন। আর নীল দামী কাগজে প্যাডটিও ছাপিয়ে নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ১০০ টাকা তুলে দিয়ে বলেছিলেন- গো অ্যাহেড, মাই ডিয়ার…।

খালিদ ভাইয়ের ওই ১০০ টাকা এখনকার হিসেবে কমপক্ষে ২০০০ টাকা। আর আমরা এখনো ট্র্যাকে রয়ে গেলাম। অ্যারেনায় আমরা যে ছিলাম মৃত্যুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া গ্ল্যাডিয়েটর। অথচ, আপনি অবিবেচকের মতো চলে গেলেন। আমরা একা হয়ে গেলাম। নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। চোখের অর্থহীন জল ছাড়া এখন আমাদের কিছু অবশেষ নেই। বিদায়।

নিশ্চয়ই আমাদের আবার দেখা হবে। ওখানে আবার স্পর্শ’র কাজ করা যাবে বেশ মাতিয়ে। আর সমস্ত দেশবাসী নয়, উভয়বঙ্গেই আবার হইচই ও তোলপাড় শুরু হয়ে যাবে। আপনাকে ছাড়া আবার কীভাবে ‘স্পর্শ’ হবে বলুন! এভাবে কি কেউ যায়?

আবু মুসা চৌধুরী কবি