বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

কবরীর দেখা পেয়েই চিরবিদায় নিলেন সারাজীবনের ‘প্রেমিক’ অসীম নন্দী!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০, ২০২১, ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদন : কৈশোরোত্তীর্ণ সময়ে সে সময়কার মিনা পালকে (পরে কবরী) বিয়ে করতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রামের ফতেয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা অসীম নন্দী। এজন্যে নগরের ফিরিঙ্গিবাজারে বসবাসরত মিনা পালের মায়ের কাছে একটি চিরকুট লিখেছিলেন অসীম নন্দী।

এরপর সময় অনেক গড়িয়েছে। মিনা পাল পরবর্তীতে কবরী সরোয়ার বা সারাহ বেগম কবরী হয়েছেন। হয়েছেন দেশবরেণ্য চিত্রনায়িকা। দুদুটো সংসারে জড়িয়েছেন। হয়েছেন ৫ সন্তানের মা।

কিন্তু সেই কবরীকে কখনোই ভুলতে পারেননি অসীম নন্দী। বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন বটে, কিন্তু জীবন-সায়াহ্নে এসেও তার একটি চাওয়া-মৃত্যুর আগে যেন একবার দেখা পান কবরীর। এই আকুতি শুনে কবরীরও ইচ্ছে জেগেছিল-একবার অসীম নন্দীর সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু সময়-সুযোগটা হয়ে উঠছিল না। যেই সুযোগটা হাতছানি দিল, অমনি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভুললেন না। এক ঘটনাচক্রে একদিন পড়ন্ত বিকেল অসীম নন্দীর ফতেয়াবাদের বাড়িতে হাজির কবরী। অসীম, তার স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা করলেন, হাসাহাসি করলেন। আর তার কয়েকদিন পরই চিরবিদায় নিলেন অসীম নন্দী; যেন মৃত্যুটির জন্যেই কবরীর অপেক্ষা!

জীবদ্দশায় প্রখ্যাত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী এক সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলো জানিয়েছিলেন, যা  তার মৃত্যুর পর দৈনিক প্রথম আলোয় ছাপা হয়।

কবরীর কাছে পত্রিকাটির প্রশ্ন ছিল এরকম–  ‘আপনার জীবনের একটি ঘটনা আমি পড়েছি। আপনি তখন খুব ছোট। আপনাদের সঙ্গে পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত একজন মানুষ আপনার মাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, ‘মিনাকে আমি বিয়ে করতে চাই।’ সে ঘটনাটি সম্পর্কে কিছু বলুন?’

প্রশ্ন শুনে চিরায়ত মিষ্টি হাসিতে কবরী বললেন–ওহো, সে তো অনেক পুরোনো কথা। তার নাম অসীম নন্দী। তার এক মেয়ের জামাই প্রথম আলোতে কাজ করে। তার মাধ্যমেই অসীম নন্দীর সঙ্গে একবার ফোনে কথা হয়। আমি বললাম, দাদা, আপনি ঢাকায় আসেন না? তিনি বললেন, যাই তো। আমি বললাম, এলে তো দেখা হতো। ফোনে তিনি নানান খুনসুটি করলেন। বললেন, তুমি তো এখন বুড়ো হয়ে গেছ। আমিও কম যাইনি। বলেছি, আপনি বুঝি খুব যুবক আছেন?

যা-ই হোক, পরে অবশ্য তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দেখা হওয়ার সেই ঘটনাটা এত নাটকীয় ছিল যে সেটা নিয়ে একটা সিনেমা বানানো যায়।-বলেন সারাহ বেগম কবরী।

কবরী বলেন, আমার কাছে একবার চট্টগ্রামের ফতেয়াবাদের একটা স্কুল উদ্বোধনের আমন্ত্রণ এল। ফতেয়াবাদ শুনেই চমকে উঠলাম। কারণ সেখানেই অসীম নন্দীর বাড়ি। কেন যেন মনে হলো, সেখানে গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। আমার কথা শুনলে তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। আমি রাজি হয়ে গেলাম।

অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি, তিনি আসেননি। তার ছেলে এসে দেখা করে জানাল, বাবা অসুস্থ। তিনি আমাকে তার বাড়িতে একবার যেতে অনুরোধ করেছেন। অনুষ্ঠান শেষ করে তার বাড়ি গেলাম। কত বছর পর দেখা! দারুণ ছিল সেই দেখা হওয়ার মুহূর্তটা। তাঁর স্ত্রী-কন্যারা সবাই উপস্থিত। অসীম নন্দী যে আমাকে পছন্দ করতেন বা বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, পরিবারের সবাই সে কথা জানেন। আমরা এক খাটে বসলাম। অনেক কথা হলো, গল্প হলো। তার এক মেয়ে ছোটবেলার সেই গল্পটা শুনতে চাইলে, বকুনি দিয়ে ওকে থামিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে ফিরে আসার সময় হয়ে এল। সেখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর থেকে আমার মোবাইলে অসীম নন্দীর নম্বর থেকে অনবরত ফোন আসতে লাগল। আমি আর ধরি না। তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, দেখা করেছি। এরপর আবার ফোনে কথা চালিয়ে যাওয়া – এসব ভালো লাগছিল না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই শেষে একবার ফোনটা ধরলাম। আমি কিছু বলার আগেই ওই পাশ থেকে একজন বলল, ‘আন্টি, আপনি যাওয়ার পরে বাবা মারা গেছেন!’ আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তার কথা শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। জানতে চাইলাম, কী হয়েছিল? বলল, ‘জানি না। আপনার সঙ্গে দেখা হলো, হইচই করল, গল্প করল। ঠিক তার কয়েক দিন পর বাবা মারা গেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই বোধ হয় বাবা অপেক্ষা করছিলেন।’ কী আশ্চর্য! ঘটনাটা এখনো আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। -যোগ করেন কবরী।