মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানে সাহিত্যবিশারদের সম্মানি ৫০, আর পাকিস্তানি উর্দু কবির সম্মানি ২ হাজার

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ৩০, ২০২১, ১০:২২ অপরাহ্ণ

হোসেন আবদুল মান্নান : বই নয় এটি যেন স্মৃতিস্মারক। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক থাকার সময় পড়েছিলাম। স্বামী বিবেকানন্দ স্টাইলে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ আমি হোঁচট খেলাম। একদম থেমে যেতে হলো আমাকে। এবার ধীরলয়ে পড়ে যাই। সন, তারিখ, ব্যক্তি, ঘটনাপ্রবাহ, তথ্য-উপাত্ত সবসময় আমাকে প্রবলভাবে টানে। তথ্যবিহীন সাদাসিধে দীর্ঘ লেখা কখনো আমাকে আটকাতে পারে না।

আমি মনে করি, লেখা হবে পাঠকের হৃদয় এবং মননস্পর্শী, যা তার অজান্তেই তাকে টেনে নিয়ে যাবে অতলান্তের যবনিকা অবধি। এক্ষেত্রে পাঠক খানিকটা পরাধীনতার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে যাবে এবং যথারীতি পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে লেখকের মুঠোয়।

বইটি সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘নোট’। সৈয়দ মুর্তাজা আমাদের ভাষা সাহিত্যের কিংবদন্তি, বহুভাষাবিদ, পণ্ডিত, রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর সহোদর ছিলেন।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। তিনি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে কর্মরত। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস. কে. দেলহাভী (সিএসপি) এবং বিভাগীয় কমিশনার নিয়াজ মুহাম্মদ খান (আইসিএস) এর নির্দেশনায় চট্টগ্রামে এক সাহিত্য সম্মিলনীর আয়োজন করেন। এখনকার দিনে হলে আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সম্মেলন বলা হতো।

চট্টগ্রামের সেই সাহিত্য সম্মিলনীতে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলা পুঁথিসাহিত্যের বিখ্যাত পণ্ডিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য সম্মানি নির্ধারণ করেন মাত্র পঞ্চাশ টাকা। প্রধান অতিথি ভারতে বসবাসকারী বিখ্যাত পাকিস্তানি উর্দু কবি হাফিজ জলন্ধরী (১৯০০-১৯৮২)। উল্লেখ্য, তিনি পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। তাঁর জন্য সম্মানি রাখেন দুই হাজার টাকা। এতে সুস্পষ্ট যে, তখন পর্যন্ত এদেশে উর্দুচর্চা বাংলার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এ অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল। উদ্বোধন করেন মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, শিল্পী আব্বাস উদ্দিন, শিক্ষাবিদ শামসুন্নাহার মাহমুদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কীর্তিগাথা তুলে ধরে প্রবন্ধ পাঠ করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুর্তাজা আলী। আলোচনান্তে শিল্পী আব্বাস উদ্দিন তাঁর ছেলে মোস্তফা কামাল এবং মেয়ে ফেরদৌসী বেগমকে নিয়ে একসঙ্গে গান গেয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন।

অনুষ্ঠান সমাপনীতে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুর্তাজা আলী। সুশীল সমাজ থেকে প্রশ্ন আসে- সভাপতির জন্য পঞ্চাশ টাকা সম্মানি এক প্রকার অসম্মানের শামিল। কালবিলম্ব না করে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনাপূর্বক সাহিত্যবিশারদের সম্মানি কিছুটা বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন তিনি।

সাহিত্য সম্মিলনীর অল্প ক’দিন পরেই চট্টগ্রাম সফর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রানা লিয়াকত। তাঁদের উর্দু কবিকে সম্মিলনীর প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করায় তিনি আয়োজকদের যথেষ্ট পরিমাণে প্রশংসাও করেছিলেন।

[কথাসাহিত্যিক হোসেন আবদুল মান্নান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, তাঁর দাপ্তরিক পরিচিতি মো. আবদুল মান্নান, তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।]