শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

আজাদ তালুকদারের রিপোর্টারের ডায়েরি : অ্যাকশন মুভির চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুলাই ১৪, ২০২১, ১২:০৭ অপরাহ্ণ

ওবায়দুল করিম দুলাল : ডায়েরি হচ্ছে দিনপঞ্জি। প্রতিদিনকার অথবা নির্দিষ্ট বিরতিতে বিভিন্ন ঘটনার পর্যবেক্ষণ, রচনাকারীর মত, আবেগ ও অনুভূতি রেকর্ড করা হয়। ডায়েরিতে। ডায়েরিতে ব্যক্তির মতের সন্নিবেশ হয়। বলা হয়, ডায়েরি হচ্ছে, `A record of events,transactions,or observations kept daily or at frequent intervals’  অথবা A daily record of personal activities, reflections, or feelings’ । খ্যাতিমানদের ডায়েরি ইতিহাসের উপাদান হতে পরে। ডায়েরি কোনও অনুসন্ধানের সূত্র হতে পারে।

আজাদ তালুকদার এর ‘রিপোর্টারের ডায়েরি‘ এর শিরোনাম জানান দেয়, এইটি সাংবাদিকের রিপোর্ট সংক্রান্ত ডায়েরি বা দিনপঞ্জি। তবে এই পঞ্জির পাঠে, পাঠককে কখনো মনে করিয়ে দিতে পারে যে, রিপোর্ট নয়, কোনো অ্যাডভেঞ্চারাস ঘটনা বা থ্রিলিং কিছু পাঠ করছেন। অনুসন্ধানের রিপোর্ট তাই কোনো অ্যাকশন মুভির চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।

সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা। সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব সংবাদ সংগ্রহ করা ও তার প্রকাশ। সংবাদ, একটি পণ্য। কারণ এর বিনিময়-মূল্য ও ব্যবহার-মূল্য আছে। আর দশটি পণ্যের মত, এই পণ্যেরও কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা আছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রয়টার, এএফ পি- এমনই সংবাদের ব্যবসায়ী। সংবাদ নামের পণ্যের শুধুমাত্র ভোগপিয়াস নেভানো নয়, এর বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জনগণকে মোটিভেট করতে পারা, মানুষের আচরণের পরিবর্তন করবার সামর্থ্য থাকা। সংবাদ বা তথ্যের এই ভূমিকার কারণেই এখনকার সমাজকে তথ্য সমাজ বা ইনফরমেশন সোসাইটি বলা হয়। এবং ইনফরমেশন তাই শাসন ও সমাজ নির্মাণের বড় হাতিয়ার।

মানুষের মৌলিক চাহিদার সবদিকেরই যেমন, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা বাসস্থান এর, উন্নয়ন সংবাদ, তথ্যের উপর নির্ভর করে।সাংবাদিকতা এখন বহুমুখী। সংবাদের প্রভাব এত বেশি যে, এমনকি বিচারেও, বিচারের আগে প্রেসট্রায়াল হয়ে যেতে পারে।

সততা ও নিষ্ঠার সাথে সংবাদের সংগ্রহ ও উপস্থাপনা সাংবাদিকতায় প্রফেশনালিজমের প্রকাশ পায়। এইক্ষেত্রে পুরোদস্তুর অবজেকটিভ হতে পারা, সাংবাদিকতার মহত্ত্বের দিক।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হয়। আজাদ তালুকদার একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি বেশ সাহসী। তাঁর ‘রিপোর্টারের ডায়েরি’ পড়লে সব পাঠকেরই তাই মনে হবে। লেখক তাঁর রিপোর্টিংয়ের পেছনের রিপোর্ট ও জানান দিয়েছেন পাঠককে। প্রথম প্রবন্ধের শেষে, কর্পোরেট ব্যবসায়ের দ্বন্দ্বের মিটমাট, সাংবাদিকতার এক প্রায় উল্লে­খহীন ঘটনা। আজাদ তাও বর্ণনা করেছেন অকপটে। আজাদ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল হতে যেয়ে, কর্ম পরিবেশ বদলিয়েছেন, অনেকবার। সেকথা তিনি বলেছেনও। শুধু নিজের প্রতিষ্ঠা নয়, পেশার দায়িত্বের প্রতি নজরও ছিল তাঁর। পরবর্তী লেখাগুলো তাই ধারণা দেয়।

‘রিপোর্টারের ডায়েরি’তে আছে ৩০টি অনুসন্ধানী স্মৃতি। বিভিন্ন ঘটনাবলীর অনুসন্ধানের বর্ণনা। মোট ১৫২ পৃষ্ঠার বই। ১২১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত রয়েছে তাঁর লেখনী, বাকি ১৩৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ‘ফোকাস‘ শিরোনামে স্মৃতিময় বিভিন্ন ঘটনাবলীর ছবি। ১৩৬ পৃষ্ঠা থেকে রয়েছে ‘পেশার টানে বিদেশ বিভূঁইয়ে’ শিরোনামে তাঁর বিদেশ অবস্থানকালের বিভিন্ন ছবি। এছাড়া তাঁর রিপোর্টিংয়েও যথেষ্ট ছবি সংযুক্ত আছে।

ছবিকে বলা হয় `silent speaker’ বা নিরব বক্তা। এক ছবিতেই অনেক তথ্যের সন্নিবেশ থাকে। তবে একথাও ঠিক, প্রযুক্তির কারণে ছবির তথ্যবিকৃতি হযে থাকে। উবে যাওয়া সোভিয়েত সমাজে, ক্রুশ্চেভকালীন অনেক ছবিতেই স্টালিনকে মুছে দেওয়া হয়। ছবির শক্তি এ থেকে অনুমান করা যায়। শুধু ছবির কালানুক্রমিক পোস্ট দেখেই, ইতিহাস রচনা করা যায়, যা Visual History হিসেবে বিবেচিত হয়। ভবিষ্যতে কোনো এক সমযে, ছবিগুলো হয়তো ইতিহাসের উপাদান হতে পারে।

বইটির প্রচ্ছদ রুচিপূর্ণ ও চোখজুড়ানো। মুদ্রণে, নিউগ্রাফ প্রিন্টার্স। প্রকাশনায়, বর্ণনা প্রকাশন। ISBN নাম্বার আছে। আছে মলাটের পেছনে বারকোড। তবে বারকোডের কোডিং এ বইয়ের শিরোনামের সাথে আরো কিছু তথ্য যোগ হলে ভালো হতো। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা, মার্কিন মুদ্রায় ১০ ডলার। উৎসর্গ করেছেন বাবা-মায়ের নামে। প্রচ্ছদের জ্যাকেটে জিটিভি ও সারাবাংলা‘র প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার কথা আছে, আজাদ তালুকদারকে নিয়ে। জ্যাকেটের শেষে আছে, সাংবাদিক ও লেখক আজাদ তালুকদার এর পরিচিতি।

সাংবাদিকতায় সাহসী হওয়া ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কালের পরিবর্তনে আজাদ তালুকদার নিজেকে এক খ্যাতিমান সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুন, এই আকাক্সক্ষা।

[প্রফেসর ড. ওবায়দুল করিম দুলাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সদ্য অবসরে যাওয়া শিক্ষক]