শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

চট্টগ্রামের সন্তান রফিকুল আনোয়ার রাসেলের প্রামাণ্যচিত্র বিশ্বদরবারে

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১, ৬:৪১ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগর ইউনিয়নের নজরেরটিলা গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল আনোয়ার রাসেলের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র আবারও জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ‘আ মেন্ডোলিন ইন এক্সাইল’ চলচ্চিত্রটি একই সাথে দুটো চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পেয়েছে- চতুর্থ বহু সাংস্কৃতিক চলচ্চিত্র উৎসব টরেন্টো, কানাডা- ২০২১ এবং সারবেস্ট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কিশিনেভ, মোলেদাভা প্রজাতন্ত্র ২০২১।

সারবেস্ট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রফিকুল আনোয়ার রাসেলের নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আ মেন্ডোলিন ইন এক্সাইল’সহ বিশ্বের আরো ১০ দেশের ১০টি চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়েছে। এগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্রের মংক আর্সেনিজ, জার্মানির ‘হ্যান্ডমেড ইন বাংলাদেশ’, ইটালির ‘বসচি, কাভার কার্বন’, স্পেনের ‘দ্য ফার্স্ট আউটব্রেক’, সার্বিয়ার ‘টুইন্স ওভেন ফ্রম ড্রিমস’, চীনের ‘আল-লা’ সুইজারল্যান্ডের ‘রিটার্ন টু দ্যা লস্ট ইডেন’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডায়াগনোসিস হেলথকেয়ার’ এবং ফ্রান্সের ‘আর্ন ইউর টার্ন’।

এ নিয়ে গত এক বছরে রাসেলের প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশসহ একের পর এক ৯টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিলো। আর সেগুলো হলো- চেঞ্জিং ফেস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল (অনলাইন) ২০২০ অস্ট্রেলিয়ান প্রিমিয়ার, লিফট-অফ সেশনস গ্লোবাল নেটওয়ার্ক লন্ডন, যুক্তরাজ্য ২০২০, ফাস্ট টাইম ফিল্ম মেকার সেশনস অফ লিফট-অফ সেশনস গ্লোবাল নেটওয়ার্ক লন্ডন, যুক্তরাজ্য ২০২০, ১৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২১, বাংলাদেশ, নবম আন্তর্জাতিক লিবারেশন ডক ফেস্ট, ২০২১ (জাতীয় প্রতিযোগিতা) বাংলাদেশ, তৃতীয় বাংলাদেশ স্বল্প ও তথ্যচিত্র চলচ্চিত্র উৎসব, ২০২১, ২২ তম রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্র ২০২১। বাকি দুটোর কথা তো শুরুতেই বলা হলো।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার স্থান পাওয়া রফিকুল আনোয়ার রাসেলের প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করা হয় ২০১৯ সালে। মুক্তি পায় ২০২০ এর শুরুর দিকে। এটির কাহিনি মূলত একজন রোহিঙ্গা মেন্ডোলিন বাদককে ঘিরে। ধর্মীয় গ-ির বেড়াজাল ছিন্ন করে একজন রোহিঙ্গা কীভাবে সংগীতে-সুরে জড়ালেন তা নিয়েই প্রামাণ্যচিত্রের গল্প। প্রামাণ্যচিত্রটির স্টোরি রাইটার এবং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন রফিকুল আনোয়ার রাসেল।

প্রামাণ্যচিত্রটি দেখানো হয়েছে কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবিরকে। অন্যান্য রোহিঙ্গাদের মতো প্রাণ বাঁচাতে মোহাম্মদ হোসেন পরিবার নিয়ে পালিয়ে আসেন আরাকান থেকে। আগে দিনমজুরের কাজ করলেও পরিবর্তিত নতুন পরিবেশে হোসেন তার একমাত্র সম্বল মেন্ডোলিন নিয়ে গান করে বেড়ান ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে। তার কথা, গান আর সুরে একদিকে যেমন জন্ম, বেড়ে উঠার ইতিহাস, জীবনযাপন আর আকাক্সক্ষার কথা জানান দেয়; তেমনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন আর নিপীড়নের যন্ত্রণাও ফুটে ওঠে। হতাশাপূর্ণ পরিবেশ, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে একজন মেন্ডোলিন বাদক মোহাম্মদ হোসেন যেন নিঃসঙ্গ এক আশার কণ্ঠ।

প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে রফিকুল আনোয়ার রাসেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, একটি ব্যক্তিগত কাজে আমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। আমার এক পরিচিত ছোটভাই এনজিওতে কাজ করতো। সে যেই ক্যাম্প নিয়ে কাজ করতো সেখানে তার আমন্ত্রণে আমি গিয়েছিলাম। ক্যাম্পের নানা অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে এক মেন্ডোলিন বাদকের কথা সে আমাকে জানায়। রোহিঙ্গা মেন্ডোলিন বাদকের গল্প শুনে আমার ইচ্ছে হলো তার সাথে দেখা করার। পরবর্তীতে সেই মেন্ডোলিন বাদকের সাথে আমি দেখা করি। তার উপর তৈরি করি আউটলাইন।

‘আপনারা জেনে থাকবেন, মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘরের ফিল্ম নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা হয়, সেখানে আমি আউটলাইনটি প্রজেক্ট আকারে জমা দিই। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় আমার প্রজেক্টটি প্রথম হয়। পুরষ্কার হিসেবে তারা প্রজেক্টটি নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরিতে আমাকে ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা করে। তাদের আর্থিক সহায়তা পেয়েই প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করার সুযোগ পেয়েছি।’- যোগ করেন নির্মাতা রফিকুল আনোয়ার রাসেল।

রাসেল বলেন, আমাদের দেশের কোনো ফিল্ম যখন আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালে যায় তখন সেটা আমাদের দেশের সকলের জন্য গর্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের অনেকে আমাদের ফিল্ম সম্পর্কে, আমাদের সম্পর্কে জানতে পারে। আর বিশ্বদরবারে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মধ্যে গর্বের পাশাপাশি আনন্দের একটা অনুভূতি থাকে যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করে মহৎ একটি কাজ করেছে যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পারেনি। এর কৃতিত্ব সরকারের পাশাপাশি দেশের মানুষেরও। এই বিষয়টি আমি আমার প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরেছি। দেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে নিয়ে সেই মেন্ডোলিন বাদকের একটি গানও আমার সেই প্রামাণ্যচিত্রে আছে। আমি মূলত বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের এই মহানুভবতা, আত্মত্যাগ ও কৃতিত্বটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

এ নির্মাতা বলেন, শিল্পকলা একাডেমিতেও আমাদের এই প্রামাণ্যচিত্রটি স্থান পেয়েছে, পাশাপাশি তথ্যমন্ত্রণালয়েও এটি যাবে। প্রামাণ্যচিত্রটি জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ারও একটি সম্ভাবনা আছে। মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে, আশা করছি যোগ্যতা অনুসারে এটি যথাযথ সম্মান পাবে।

ব্যক্তিগতভাবে রফিকুল আনোয়ার রাসেল নিজেকে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার ধ্যান-জ্ঞান কেবল চলচ্চিত্র। তাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন ‘পিএসআই’-এর মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দামি চাকরি ছেড়ে হয়েছেন একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। এখন পুরোদমেই ছবি নিয়ে তার কাজকারবার।

চলচ্চিত্রের প্রতি রাসেলের নেশা বহু আগে থেকে। ১৯৯৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন তিনি। ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অযান্ত্রিক’ নামের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ সেন্টার। ২০০৮ সালে ‘হাইজ্যাক’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তথ্যচিত্র, টিভি প্রোডাকশন এবং নানা স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র নিয়ে কাজ করেন। ‘সময়’, ‘তাড়া’, ‘দেয়াল’, ‘লাইটম্যান’ ইত্যাদি স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের তিনি চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক, অভিনয় এবং প্রযোজনাসহ নানাভাবে সম্পৃক্ত।

শুধু তা নয়, চলচ্চিত্র পাঠ ও নির্মাণ বিষয়ে তিনি সমালোচক এবং স্বাধীন গবেষক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ২০১৪ সালে তিনি ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারাস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন। ২০১৫ সালে এ চলচ্চিত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রতিযোগিতায় শর্টফিল্ম বিভাগে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করেন। ২০১৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কো প্রোডাকশন মার্কেট ডক এজ ২০১৯ সেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এরপর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ‘এক্সপজিশন অফ ইয়াং ফিল্ম ট্যালেন্ট’, ২০১৯ কর্মশালা প্রতিযোগিতায় ‘আ মেন্ডোলিন ইন এক্সাইল’ তথ্যচিত্র প্রজেক্টের জন্য ‘সেরা প্রজেক্ট’ পুরস্কার লাভ করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা রফিকুল আনোয়ার রাসেল ঢাকা ডকল্যাব ২০১৯ সেশনে একই প্রজেক্টের জন্য প্রশংসিত হন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ভারতের গোয়া আন্তর্জাতিক কো প্রোডাকশন মার্কেট ফিল্মবাজারে তার পূর্ণাঙ্গ সাইকো থ্রিলার কাহিনিচিত্র ‘স্বপ্নচারী’র জন্য ‘প্রডিউসারস ওয়র্কশপ’ নির্বাচিত হন।

বর্তমানে টিভি, অনলাইন এবং চলচ্চিত্রে পেশাদার চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত এই গুণী চলচ্চিত্রনির্মাতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ‘গেস্ট টিচার’ হিসেবেও শিক্ষকতা করেছেন তিনি। রাসেলের বাবার নাম আনোয়ারুল আজিম। মা সকিনা বেগম। বাবা প্রয়াত হয়েছেন। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে রাসেল সর্বকনিষ্ঠ।