সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

নৈরাজ্যের সড়কে বিপজ্জনক বিশৃঙ্খলা

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১, ১:৩০ অপরাহ্ণ

  • গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বেড়েছে
  • মামলা-জরিমানাতেই আটকে আছে শৃঙ্খলার উদ্যোগ
  • রাস্তায় পার্কিংয়ের অনুমতি দিয়ে সমালোচনার মুখে পুলিশ
  • ‘টেন্ডল’ নিয়োগ দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার সড়ক পরিবহন আইন করলেও সেটি কার্যকর করতে পারছে না। সেই আইনের বিরুদ্ধে ধর্মঘটও পালন করেছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। যার ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। সড়কে চলাচল সংকেত ঠিক নেই। ফিটনেসবিহীন যানবাহনও চলছে। চালকের বেপরোয়া মনোভাব বন্ধ হয়নি। এর সঙ্গে দাবি আদায়ে বহাল আছে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর কথায় কথায় মানুষকে জিম্মি করার পুরোনো কৌশল। রাস্তাঘাটগুলো একেকটা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে যানবাহন চলাচলে ভয়ংকর নৈরাজ্য চলছে। চালকদের সড়কের লেন অনুসরণ করার বালাই তো নেই-ই, উপরন্তু তারা আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে মহাবিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। প্রতিটি বাস-মিনিবাসের শরীরে সেই প্রতিযোগিতার ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়। এভাবে সড়কে যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কিছুতেই।

রোডটি সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’ এ বলা হয়েছে, ২০২০ সালে দেশে চার হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং সাত হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ রাজনীতির ধারাবাহিক চর্চার কারণে গড়ে উঠেছে। এখানে অনেকগুলো কারণ জড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। তবে প্রধান ও উৎস কারণ- দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির তথাকথিত রাজনীতি।

অন্যদিকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, পরিবহন খাতে একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা জিইয়ে রেখে চাঁদাবাজি করছে। এ গোষ্ঠীর হাতে পরিবহন খাত জিম্মি। খাতটি থেকে প্রতি মাসে ৩০০ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়। এসব চাঁদা অতিরিক্ত ভাড়ার অংকে যাত্রীদের কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।- এই অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে নেমে বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২০১৮ সালে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩। গত দুই বছরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অবৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য চালক লাইসেন্স আছে প্রায় ২৮ লাখ। এর মধ্যে একই লাইসেন্সে একজন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ও অন্য যানবাহন চালান। তাদের বাদ দিলে চালকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ। সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৮ লাখ। অর্থাৎ ১৮ লাখ যানবাহন ‘ভুয়া’ চালক দিয়ে চলছে।

সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য ও পরিবহন নেতাসহ সংশ্লিষ্টরা এসব অনিয়ম ও গাফিলতিকে পুঁজি করে অবৈধ উপার্জনে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা আসার বদলে একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে চলেছে। চালকদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া কিংবা মামলার ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার নাম করে চালকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিআরটিএ কেন্দ্রিক হড়ে ওঠা কিছু চক্র। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী নিজেও বিআরটিএর দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে ‘যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধের পদক্ষেপ চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি। এতে অংশ নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘লকডাউন পরবর্তী চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি আরও এক দফা বেড়েছে। এখানে শহরতলীতে বসবাস করা ব্যক্তিরা প্রতিদিন এই নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছেন। এখানে সকালে এক ভাড়া, বিকেলে আরেক ভাড়া, রাত হলে আরেক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। রোদেলা দিনে এক ভাড়া, বৃষ্টি হলে আরেক ভাড়া আদায় করা হয়। অতীতে চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রতিটি উপজেলায় যাতায়াতের বাস নেটওয়ার্ক ছিল। এসব নৈরাজ্যের হাত প্রসারিত করার সুদূর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে সব বাস নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও টুকটুকি এখন বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। এসব বাহনে ভাড়া কয়েকগুণ বেশি। যত্রতত্র পার্কিং, যানজট ও দুর্ঘটনার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এসব বাহন।’

এদিকে মোটরযান আইন অনুযায়ী, সড়কে গাড়ি আইন মেনে চলছে কি না তা দেখার ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে। আইন লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং জরিমানা করার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। উল্টো পুলিশের এই বিভাগের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা, হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে নগরজুড়ে পুলিশের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

তবে সড়ক সচল রাখার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক বিভাগকে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খেতে হচ্ছে যানজট নিরসনে। প্রায় সড়কে ভয়াবহ যানজটে বাড়ছে দুর্ভোগ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ও বন্দর কেন্দ্রিক পরিবহনের চাপের পাশাপাশি যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে চসিক ও ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনা। নগরের প্রায় সড়কে ট্রাফিক সিগনাল বাতি থাকলেও সেগুলো অচল পড়ে আছে। ফলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের একমাত্র ভরসা হাতের ইশারা। বেশিরভাগ সময়ই যানবাহনকে ট্রাফিক পুলিশের এই ইশারা মানতে দেখা যায় না। পুলিশের ইশারা অমান্য করে রাস্তায় বাড়ছে বেপরোয়া যানচলাচল।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) যানবাহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ও নতুনত্বের ছোঁয়া লাগলেও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগের ভরসা এখনও মান্ধাতা আমলের সেই হাতের ইশারা। যদিও ২০১২ সালে নগরের প্রায় ২৫টি মোড়ে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো হয় সিগন্যাল বাতি। যার ১০টিতে ১৫ ওয়াটের এলইডি এবং ১৫টিতে ৫০ থেকে ১০০ ওয়াটের হ্যালোজেন বাতি লাগানো হয়েছিল। বাতিগুলোর সবগুলোই এখন অকার্যকর। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালু করে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। নগরের আগ্রাবাদ বারেক বিল্ডিং, চৌমুহনী, বাদামতল, টাইগারপাস, ওয়াসা, দুই নম্বর গেইট এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় রিমোটের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। এই উদ্যোগের ৬ মাস না যেতেই ফের অকেজো হয়ে যায় সিগন্যাল বাতি। তাই ট্রাফিক পুলিশের হাত উঁচিয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টাই শেষ ভরসা। হাতের ইশারাকে সিগন্যাল মেনে একদিকে থামানোর চেষ্টা অন্যদিকে সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ির ছুটে চলা এখন নিত্যকার ঘটনা।

নগরের আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, টাইগারপাস, লালখানবাজার, ওয়াসা সহ ২৫টি মোড়ে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় সব সিগনাল বাতিই পড়ে আছে অচল ও অরক্ষিত অবস্থায়। কোনো কোনো স্থানে সিগন্যাল বাতিই নেই। আবার অনেক জায়গায় এসব সিগন্যাল বাতি ভেঙে হয়েছে চৌচির। হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করতে কখনো দীর্ঘ আবার কখনো খুব কম সময় গাড়ি আটকে রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে ট্রাফিক পুলিশকে। হাতের ইশারা অমান্য করে বেশকিছু যানবাহন চললে তাদের পিছনে লাঠি নিয়ে তাড়া করার দৃশ্যও দেখা গেছে। আবার অনেক মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও তাদের নিরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

ওয়াসা মোড়ে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য একুশে পত্রিকাকে বলেন, হাতের ইশারায় আমাদের এই ব্যস্ত সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অনেক সময় হাতের ইশারা না মেনে আগেভাগেই গাড়িগুলো চলতে থাকে, মাঝেমধ্যে তো ইশারা দিলেও গাড়ি থামে না। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি থাকলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আমাদের সুবিধা হতো। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি যানজটের ভোগান্তিও অনেকাংশে কমে যেতো। আর সিগন্যাল বাতি দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে জনবলও কম লাগবে।’

তবে সিটি কর্পোরেশনের খামখেয়ালির কারণে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সুরাহা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। সিটি কর্পোরেশনের সাথে এ বিষয়ে কথা হয়েছিল। এসব সিগন্যাল বাতি সংস্কারের পরিকল্পনার কথা আমাদের জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিদ্যুৎ শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কান্তি দাশ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটি আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে কাজির দেউড়ি ও নিউমার্কেট মোড়ে ডিসেম্বরের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হবে। সফল হলে পরবর্তীতে শহরের বাকি মোড়গুলোতে বসবে সিগন্যাল বাতি। ইতোমধ্যে কনসালট্যান্ট নিয়োগের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এক্সপার্ট কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে সার্ভের মাধ্যমে কাজটা করা হবে। যদিও বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।’

এদিকে, ট্রাফিক পুলিশের সামনেই নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চলছে পার্কিং নৈরাজ্য। অবৈধ পার্কিং যে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে এর প্রমাণ মিলে নগরের অলংকার থেকে এ কে খান পর্যন্ত সড়কে। ঢাকা-চট্টগ্রাম সংযোগ সড়কটির দুপাশ জুড়ে অবৈধভাবে পার্কিং করা শত শত বাসের কারণে ত্রমশ বাড়ছে যানজট, জনগণকে পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। যানবাহন যত্রতত্র পার্কিং করলে মালিকের বিরুদ্ধে মোটরযান আইনে ট্রাফিক পুলিশের মামলা করার এখতিয়ার থাকলেও এ ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

অভিযোগ আছে, অবৈধ এসব গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে অলংকার ও এ. কে. খান এলাকার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করেই। দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে দৈনিক ৩০০-৫০০ টাকা দেওয়ার বিনিময়ে এসব গাড়ি সড়কে রাখার মৌখিক অনুমোদন পান বাস চালকেরা। তবে নিজ নিজ কাউন্টারের সামনে বাস রাখতে চাইলে অতিরিক্ত ১০০ টাকা গুনতে হয় বাস চালকদের। এছাড়া এক-দেড়শ টাকা দিলেই সারারাত সড়কে নিরাপদে পার্কিং মিলে যে কোনো গাড়ির। ট্রাফিক পুলিশের নির্ধারিত পাহারাদার করে থাকেন এই কাজ।

জানা যায়, অলংকার একে খান এলাকায় রয়েছে আন্তঃজেলা পরিহনের ২ শতাধিক বাস কাউন্টার। এসব কাউন্টারের বাসে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার সুবিধা থাকায় যাত্রীরা ভিড় করেন কাউন্টারগুলোতে। আর এসব যাত্রীদের গাড়িতে ভিড়াতে সরাসরি রাস্তায় গাড়ি রাখার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন গাড়ি চালক-হেল্পার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামি পরিবহন, শাহিন এক্সপ্রেস, আম্মাজান, মায়ের দোয়া, হিনো, বসুরহ হাট এক্সপ্রেস, এস এন ট্রেভেলস, এইচ আর ট্রাভেলস, স্টার লাইন, দিগন্ত, স্বাধীন, এনা, ঈগল, নাহার মোটরস, সৌদিয়া, নজরুল ক্লাসিক, শ্যামলী পরিবহন, শ্যামলী এন্টারপ্রাইজ, ফাহিম এন্টারপ্রাইজ, আনন্দ পরিবহন, আল জাবির, বাঁধন পরিবহন, শাহী ক্লাসিক, চয়েস, তিশা প্লাটিনাম, রয়েল এক্সপ্রেস, নন্দিনী ট্রাভেলস, আলিফ, শাহ পরিবহন, সততা স্পেশাল, সেন্টমার্টিন পরিবহন, ডলফিন, জয় এন্টারপ্রাইজ সুমন ক্লাসিক, ফাতেমা ক্লাসিক, সোহাগ ক্লাসিক, এ ওয়ান ট্রাভেলস, বৈশাখী, সোনালী পরিবহন সহ আরও বেশ কিছু বাস কাউন্টারের কাছ থেকে পুলিশের নাম দিয়ে নিয়মিত মাসোহারা তোলা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই সড়কে অবস্থান করে দেখা গেছে, অলংকার ও এ. কে. খান মোড়ের টাফিক পুলিশ বক্সের সামনে অন্তত ১৫৯টি গাড়ি অবৈধভাবে পার্কিং করা হয়েছে। স্থানীয় দোকানদার ও কাউন্টার সংশ্লিষ্টরা জানান, এভাবে গাড়ি রাখার জন্য নিয়মিত টাকা দিতে হয়। পুলিশের নাম দিয়ে কিছু লোক এই টাকা তোলে, যারা টেন্ডল নামে পরিচিত। টাকা দিলে মিলে পার্কিং আর টাকা না দিলে মামলা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অলংকার এলাকার একটি বাস কাউন্টারের কর্মচারী বলেন, আমাদের আন্তঃজেলা পরিবহনে ৯টি বাস আছে। কাউন্টারের সামনে গাড়ি রাখতে গাড়ি প্রতি ৪০০ টাকা দিতে হয়। আর ১০০ টাকা বেশি দিলে রাতের বেলায়ও অবাধে পার্কিং করা যায়। এমরান ও সোহেল নামে দুজন ব্যক্তি পুলিশের হয়ে এই টাকা নিয়ে আসছেন বলে জানান তিনি।

এখানেই শেষ নয়, অলংকার ও এ কে খান মোড়- এই দুটি পয়েন্টে প্রতি সপ্তাহে নতুন দায়িত্ব পাওয়া ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে বন্দরগামী ট্রাক-লরি থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি গাড়ি থামিয়ে চলে চাঁদাবাজি। গাড়ি প্রতি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা দিলে মিলে ‘মুক্তি’। অন্যথায় গাড়ির কাগজপত্র দেখার নামে হয়রানির অভিযোগ কম নয়।

জামাল উদ্দিন নামের একজন বাসচালক একুশে পত্রিকাকে অভিযোগ করে বলেন, ‘কথিত টেন্ডল দিয়েই চলছে চাঁদা আদায়ের কাজ। এই টেন্ডলদের হাতে থাকে সবুজ আলোর লেজার লাইট। এর ইশারায় তারা গাড়ি থামিয়ে চালকের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে থাকেন। কোনো চালক চাঁদা দিতে অসম্মতি জানালে সেই লেজার লাইটের ইশারায় বিষয়টি পুলিশকে বুঝিয়ে দেয় তারা। সাথে সাথে গাড়ি আটকে নানান টালবাহানা করে দেওয়া হয় মামলা।’

এদিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর চাঁদাবাজি বন্ধসহ ১৫ দফা দাবিতে সারা দেশে ডাকা ধর্মঘটের ডাক দেয় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইমমুভার মালিক-শ্রমিকরা। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৫ দফা দাবির বিষয়টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট। বিষয়গুলো সমাধানে সরকার সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। পুলিশের সদস্যরা যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকেন তবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর কদমতলীতে আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম, মোংলা সমুদ্র বন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছিল। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ১৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- যেসব চালক ভারী মোটরযান চালাচ্ছে তাদের সহজ শর্তে এবং ভারী লাইসেন্স দেয়া, ড্রাইভিং লাইসেন্সের নবায়ন ক্ষেত্রে পুনরায় হয়রানিমূলক ফিটনেস ও পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করা, মোটরযান মালিকদের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা, চালক ও সহকারীকে বন্দরে হয়রানিমুক্ত প্রবেশের সুবিধার্থে বার্ষিক নবায়নযোগ্য বায়োমেট্রিক স্মার্টকার্ড দেয়া, গাড়ির যত্রতত্র চেকিং ও পুলিশের ঘুষ বাণিজ্যসহ সব প্রকার হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধ করা প্রভৃতি।

ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর গত ৬ অক্টোবর নগরের অলঙ্কার মোড়ে পরিবহনের লাইনম্যান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে পাহাড়তলী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এরপর ৭ অক্টোবর হঠাৎ চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেয় মালিক-শ্রমিকরা। এতে দুর্ভোগে পড়েন কর্মস্থলগামী লোকজন ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। বাড়তি ভাড়া গুনে কেউ কেউ সিএনজি অটোরিকশায় কর্মস্থলে গিয়েছেন।

এ বিষয়ে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম ইউসুফ বলেন, ‘কিছুদিন ধরে তথ্য পাচ্ছিলাম নগরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নগরের অলঙ্কার এলাকা থেকে পাঁচজন চিহ্নিত চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করি। তাদের কাছ থেকে চাঁদার অর্থও উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরিবহনে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে আসছে তারা। এর জের ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল জনদুর্ভোগ বাড়ানোর জন্য পরিবহন বন্ধ রাখে। আমরা তাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কে অপরিকল্পিতভাবে পার্কিংয়ের অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে সিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগকে। এমন ঘটনা ঘটেছে নগরের শহীদ সাইফুদ্দীন খালেদ সড়কে। শিশুপার্ক, সার্কিট হাউস, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, রেডিসন-ব্লু সহ বেশকিছু স্থাপনা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে প্রতিনিয়ত থাকে যানবাহনের চাপ। এরপরও সড়কটির উপর পার্কিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে, যার কারণে অন্যান্য সড়কের মত এখানেও যানজট নিত্যকার ঘটনা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির দুপাশে পার্কিংয়ের অনুমতি দিয়ে ৬টি সাইনবোর্ড লাগিয়েছে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। প্রতিটি সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘এক সারিতে পার্কিং’। এর ফলে ট্যাক্সি-টেম্পো, কার, মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি। সড়কের বড় জায়গাজুড়ে পার্কিংয়ে থাকা এসব গাড়ির কারণে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত লেগে থাকে তীব্র যানজট। এতে করে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি পরিবহন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকেও।

কাজির দেউড়ি মোড়ের মাত্র ২০ গজ সামনেই একটি পুলিশ বক্স। সেখানে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘যানজট এতো বেড়েছে যে আমরা দম ফেলার সময় পাই না। যানজটের প্রধান কারণ সড়কের উপর পার্কিং। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সড়কের উপর পার্কিংয়ের অনুমতি দিয়েছে। ফলে যানজট হচ্ছে, আর আমাদেরকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।’

১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় সড়কটিতে আড়াআড়িভাবে পার্কিং করা একজন মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘সড়কে পার্কিং করা অবৈধ- এটা ঠিক। তবে ট্রাফিক বিভাগ যেহেতু পার্কিংয়ের নির্দেশনা দিয়েছে তাই আমরা পার্কিং করেছি। আর এখানে পার্কিং করতে তো কোনো ভাড়াও দিতে হয় না, যতক্ষণ ইচ্ছা গাড়ি রাখা যায়।’ ওই সড়কে পার্কিং করা বেশ কয়েকজন গাড়ি চালকের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা হলে তারা সকলেই প্রায় একই ধরনের উত্তর দেন।

যদিও এসব গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্ট যানজটে ভোগান্তির শিকার যাত্রীদের বক্তব্য ভিন্ন। এমন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কে রাস্তার উপর পার্কিংয়ের অনুমতি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের মতে, এ ধরনের অবৈধ কাজে বৈধতা দিয়ে আইনের লঙ্ঘন করেছে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। তাছাড়া সড়কে উন্মুক্ত পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবিও জানান তারা।

নগরজুড়ে অবৈধ পার্কিং যানজটের প্রধান কারণ হলেও যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা এসব যানবাহনের বিরদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা এ বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই ট্রাফিক বিভাগের। সিটি বাস, হিউম্যান হলার, টেম্পো সড়কের যত্রতত্র দাঁড়ানোর ফলে যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও এক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

এদিকে নগরের ইপিজেড, বন্দরটিলা, ফ্রিপোর্ট, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, টাইগারপাস, লালখানবাজার, ওয়াসা, জিইসি, ২নং গেইট, বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, নিউমার্কেট, টেরিবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট নিত্যকার ঘটনা। সড়কের উভয় পাশের বেশিরভাগ জায়গায় প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক, টেম্পো পার্কিং করা থাকলেও দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে অনেকটা নিশ্চুপ ভূমিকায় থাকতে দেখা যায়। এতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি ছোটখাট দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই।

অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ, সড়কজুড়ে বাস-ট্রাক থেকে শুরু করে বিভিন্নধরনের গাড়ি অবৈধভাবে পার্কিংসহ আইনভঙ্গ করলেও এসব পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয় না। ট্রাফিক পুলিশ মোটরসাইকেল ধরা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অনেক সময় নানা অজুহাতে মামলা দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরিফুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সড়কে অবৈধভাবে পার্কিং করা বেশিরভাগ গাড়ির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না ট্রাফিক বিভাগকে। বেশিরভাগ সময় শুধু মোটরসাইকেল চালকদের জরিমানা করতে দেখা যায়। এমনটাও দেখা গেছে সড়কে প্রায় এক কি.মি. দীর্ঘ যানজট লেগে আছে কিন্তু পুলিশ একটি মোটরসাইকেল চালককেই মামলা দিতে ব্যস্ত। যেকোনো সড়কেই খেয়াল করলেই এমন চিত্রের দেখা মিলবে অহরহ।’

ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ দুর্ব্যবহার পাচ্ছেন অভিযোগ করে সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে জানালার গ্লাসে লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করতে করতে এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আমাকে কাগজপত্র দেখাতে বলেন। কাগজ বের করার সময় না দিয়েই তিনি বলতে থাকেন, আমি বুঝতে পেরেছি আপনার কাগজ নেই। কাগজ ছাড়া ঘুরছেন? গাড়ি সাইড করেন। কাগজ বের করার সময় চাইলে তিনি মামলার হুমকি দিয়ে বলেন, আমরা চাইলেই মামলা দিতে পারি, কিছু না হলেও দিতে পারি। পরবর্তীতে আমার পেশা জানতে চাইলে আমি পরিচয় দেই। তখন ওই পুলিশ সদস্য বলেন, অ্যাডভোকেট বলে ছেড়ে দিলাম। যান, চলে যান।’

অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘সিটি বাস ও বিভিন্নগাড়িতে ট্রাফিক পুলিশ এক ধরণের টোকেন দিয়ে থাকে, যেগুলো মাসিক টাকা দিয়ে নিতে হয়। এই টোকেনধারীরা অবৈধ পার্কিং থেকে শুরু করে আইনের লঙ্ঘন করলেও তাদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে কাজ করেন তারা যদি এ ধরণের কাজ করেন তাহলে জনগণ কার কাছে নিরাপত্তা পাবে? ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যথাযথ নজরদারি ও তদারকি না থাকায় এসব অপকর্ম হচ্ছে।’

অবৈধ পার্কিংয়ের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সড়কের কোথাও না কোথাও পার্কিং করার সুযোগ তো দিতে হবে, না হলে যানবাহন এলোমেলোভাবে পার্কিং করবে। এটা নতুন কিছু নয়। এর আগেও সড়কের উপর একটি সিঙ্গেল লাইনে পার্কিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু আমাদের পার্কিংয়ের বিকল্প জায়গা নেই, তাই এভাবেই আমাদের সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে।’

ট্রাফিক পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন অনিয়ম কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরণের অনিয়মের কোন প্রমাণ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো। সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে এ ধরণের কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদেরকে জানানোর জন্য। অন্যায় করে কেউ পার পাবে না, কোনো অন্যায়কারীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সড়কে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে মুঠোফোনে খুদে বার্তায় এ বিষয়ে জানিয়ে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। যদিও সিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগ দেওয়ার তিনদিন পর চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে চট্টগ্রামের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্দশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিকের ম্যানেজমেন্ট, এনফোর্সমেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং তিনটি বিষয় আছে। এনফোর্সমেন্টটা আমাদের মূল দায়িত্ব। দায়িত্ব নিয়েই আমি ট্রাফিক বিভাগের সাথে বসেছি। তাদের কাছ থেকে স্পটভিত্তিক সমস্যা জানতে চেয়েছি। তারা সমস্যা চিহ্নিত করে আমাকে জানাবে বলেছে।’ পাশাপাশি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

সিএমপি কমিশনার আরও বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রামের এক অংশে বড় উন্নয়ন কাজ চলছে। এর প্রভাব তো অবশ্যই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর পড়েছে। রাস্তার মানও ভালো না। চট্টগ্রাম অন্য শহরের মতো না। এখানে বন্দর আছে, বন্দরের কার্গো হ্যান্ডেলিং বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে বন্দরকেন্দ্রীক পরিবহনও বেড়েছে। এর জন্য আমরা দায়ী না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডতো আর সিএমপিকে বলে শুরু করে না।’ ট্রাফিক বিভাগকেও ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি।