সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেই নানা ত্রুটি, দুর্বল হচ্ছে মামলা

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৮, ২০২১, ১২:২৩ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : কঠোর আইন, প্রচার-প্রচারণা ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত তথ্যের বরাত দিয়ে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জানিয়েছে, গত অক্টোবর মাসে সারাদেশে ৫২টি শিশু-কিশোরীসহ ৭৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৪টি, গণধর্ষণ ১৮টি, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা তিনটি। ওই মাসে সাতটি প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪৬টি। এমএসএফ বলছে, অক্টোবর মাসে দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা যেমন— ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বিগত মাসগুলোর মতই অব্যাহত রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এমএসএফ যেসব তথ্য দিয়েছে, তার তুলনায় বাস্তবে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা কয়েকগুণ বেশি। সব ঘটনা গণমাধ্যমে না আসায় তা জানাও কঠিন। এসব ঘটনায় মামলা হলেও আইনি ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বেশিরভাগ অভিযুক্তই রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ৯০ ভাগ আসামিই খালাস পেয়ে যায়। নির্যাতিত নারী-শিশুদের সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনের নেতারাও বলছেন, মামলা করা এবং পরবর্তী সময়ে ভিকটিমকে হয়রানি, বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে অনেক বাদী মামলা নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে চূড়ান্ত রায়ে খালাস পেয়ে যায় আসামিরা। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মামলা চলাকালেই বাদীপক্ষ মীমাংসা করতে বাধ্য হয়।

নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অপরাধ মোকাবেলা ও শাস্তি প্রদানের জন্য দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ বলবৎ আছে। আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যপূরণ সন্তোষজনক নয় বলে সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে জানা যায়, গত ৭ বছরে ধর্ষণ বা যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগে বেশ কয়েক হাজার মামলার মধ্যে চট্টগ্রামের সাতটি ট্রাইবুন্যালে অল্প সংখ্যক আসামি শাস্তি বা দন্ডপ্রাপ্ত হয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কার্যকরভাবে প্রতিরোধে সক্ষম না হওয়ার আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে নানা মহল থেকে সমালোচনা হচ্ছে। আইনটির অপপ্রয়োগের হারও আশংকাজনক। এই প্রেক্ষাপটে বিচারকগণও দোষী সাব্যস্ত করতে ও গুরুদণ্ড আরোপে সাবধানতা অবলম্বন করতে অনেকটাই বাধ্য হন। এমন বাস্তবতায় আইনটির সার্বিক সংস্কার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মত দিয়েছে আইন কমিশন।

আইন কমিশন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্যে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধনে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি সেমিনার ও আলোচনা সভা পরিচালনা করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর পর্যালোচনা শেষে এর উপর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের মতামত নেওয়া হয়। এরপর, বিদ্যমান আইনটি পর্যালোচনা শেষে প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা সরকারের কাছে তুলে ধরে আইন কমিশন।

নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০২১ সংক্রান্ত খসড়া প্রণয়নের ধারণাপত্র শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশ করে আইন কমিশন। এতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান আইনে ধর্ষণের শাস্তির বিধান করা হয়েছে, কিন্তু ধর্ষণের সংজ্ঞা ১৮৬০ সালের প্যানেল কোডে এ বর্ণিত সংজ্ঞাই রয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের নানা প্রকৃতির ধর্ষণ তার আওতায় আসেনা। বিশ্বের সমসাময়িক ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনগুলোতে অনেক ধরনের যৌন নির্যাতনকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কাজেই বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ধর্ষণের সঠিক সম্প্রসারিত সংজ্ঞা প্রদান করা প্রয়োজন। ধর্ষণ ছাড়াও বিকৃত যৌন আচরণের কারণে আরও বিভিন্ন ধরনের ‘যৌন সহিংসতা’ ইদানিং সমাজে ঘটছে। এসব যৌন অপরাধগুলোও সংজ্ঞায়িত করে শাস্তির আওতায় আনবার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে।

আইন কমিশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশে প্রায়ই দেখা যায় বাড়ীতে কাজের সাহায্যকারী নারী ও শিশুদের উপর গৃহকর্ত্রীরা গরম পানি, তেল বা গরম খুন্তি দিয়ে নির্যাতন করে যা নারী বা শিশুর যে কোন শারীরিক বিকৃতি, অঙ্গহানি বা দৃষ্টিহানি ঘটাতে পারে। কিন্তু বর্তমান আইনে গরম তেল, গরম পানি বা গরম খুন্তি দ্বারা আহত অপরাধের শিকারের উপর সংঘটিত এইসব অপরাধের বিচার করা কঠিন হতে পারে। কাজেই প্রস্তাবিত আইনে কোন তীব্র জ্বালাদায়ক দহনকারী তপ্ত তরল পদার্থ বা ধাতব বস্তু কথাগুলি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বর্তমান আইনে অপহরণের চেষ্টা এবং অপহরণের পর হত্যার অপরাধের দণ্ডের কথা বলা নেই। অপরাধের শিকার নারীর সুবিচার নিশ্চিতে প্রস্তাবিত নতুন আইনে নারী অপহরণ এবং অপহরণের চেষ্টার জন্য শাস্তি, অপহরণের পর অপহৃত নারীকে হত্যার জন্য শাস্তি এবং অপহরণকারীর হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে অপহৃত নারীর মৃত্যু ঘটানোর শাস্তির বিধান সংযুক্তি করা হলো।

এতে আরও বলা হয়, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দণ্ড নির্ধারণ হয়ে থাকে। বর্তমান আইনে মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে আটকের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডসহ অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের বিধানের উল্লেখ আছে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী এইরূপ দণ্ড কঠোর বলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীগণ মত প্রকাশ করেছেন। বর্তমান আইনে অপরাধের শাস্তি কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মতামত এসেছে। তাছাড়া, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ কত বৎসর তা সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। প্রস্তাবিত আইনে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের মেয়াদ বলা হয়েছে। কিন্তু সচেতনভাবেই অন্যূন মেয়াদ বলা হয়নি, যাতে বিচারকগণ ঘটনার প্রেক্ষাপটে শাস্তির মেয়াদ নির্ধারণ করতে পারেন। অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী অর্থদন্ডের সর্বোচ্চ পরিমাণ আইনে উল্লেখ থাকলে বিচার কাজে স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্যতা থাকে। বর্তমান আইনের সব বিধানে অর্থদণ্ডের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ নাই, বর্তমান আইনে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অর্থদণ্ডের সর্বোচ্চ পরিমাণ উল্লেখ করে প্রস্তাবিত আইনে বিধান করা হয়েছে।

দন্ডবিধির সংজ্ঞায় ধর্ষণ ঘটনার ভুক্তভোগীর ‘সম্মতি’ শব্দটি নেই। বিচারের সময় অনেক ধর্ষণের মামলাতে অপরাধের শিকার নারীর সম্মতি’র প্রশ্নে তার চিৎকার ও বাধা প্রদানজনিত শারীরিক চিহ্নের উপর খুব বেশি জোর দেওয়া হয়। অথচ সব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর শরীরে ধর্ষণজনিত অত্যাচারের চিহ্ন নাও থাকতে পারে। ধর্ষণের সম্মতি প্রসঙ্গে বর্তমান আইনে ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোন নারীর এবং ১৬ বছরের কম বয়সের কোন নারীর ধর্ষণের বেলায় সম্মতি প্রদানের ধরন ও সম্মতি প্রদানের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কেননা ১৬ বছরের কম বয়সের কোন নারীর ক্ষেত্রে সম্মতি মূল্যহীন হলেও অনেক সময়, দণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান আইনে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ সম্মতি আদায় করে যৌনসংগম ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও একাধিকবার যৌনসংগমের ভিত্তিতে আদালত ধরে নেয় যে এতে নারীর নিরব সম্মতি ছিল। প্রস্তাবিত আইনে প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়ের বিষয়টি সুস্পষ্ট করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। কোন সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য যে কোন ব্যক্তি যার হেফাজত থাকাকালীন বা আওতাধীন ক্ষেত্র বা এলাকায় কোন নারীর অবস্থানের সুযোগ গ্রহণ করে সেই নারীকে ধর্ষণ করে তবে সাধারণ ধর্ষণকারী অপেক্ষা তাদের শাস্তি অধিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে ‘সরকারি কর্মকর্তা’ উল্লেখ না করে ‘যে কোন ব্যক্তি’ উল্লেখ করলে সরকারি কর্মকর্তাসহ সকলেই বোঝাবে। ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ অপরাধ হিসাবে স্বীকৃত এবং ধর্ষণ করার ইচ্ছায় বা অভিপ্রায়ে প্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধের শিকার নারীর উপর এমন কোন আচরণ সংঘটন করে যাহা নিশ্চিতভাবে ধর্ষণের অভিপ্রায় প্রকাশ করে।

আইন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান আইনে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন নারী ধর্ষিতা হইলে হেফাজতের জন্য দায়ী ব্যক্তির অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর কারাদন্ডের সাথে অনুন্য দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধানের উল্লেখ আছে। যেহেতু হেফাজতকারীর অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার জন্য একজন নারীর সম্ভ্রমহানী হয়েছে সেহেতু অর্থদণ্ডের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হলে হেফাজতের জন্য দায়ী ব্যক্তি আরও সচেতন এবং দায়িত্বশীল হবেন বলে মতামত পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে ধর্ষণের শিকার নারীর আত্মহত্যা করার পেছনে সালিশ বা ফতোয়া খুব ব্যাপক নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে যা দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অবশ্যই তার নিরসন হওয়া প্রয়োজন। দেখা যায় সমাজের সালিশ বা ফতোয়াকারী ধর্মীয় বিধানের অপব্যাখ্যা করে ধর্ষণের শিকার একজন নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের কোন প্রতিকার না করে বরং তাকেই অনেক সময়েই উল্টো দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি প্রদান করে। ফলে সম্ভ্রম হারানো নারী তার জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে প্রায়শই আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

আইন কমিশনের মতে, বর্তমান আইনের ১১ (ক) ধারায় হত্যার জন্য কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতিরিক্ত কঠোর এবং অমানবিক। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই আইনে অন্য কোন সাজার বিধান না থাকার কারণে অনেক সময়েই বিচারে দোষী সাব্যস্তের পরিবর্তে খালাস হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। বর্তমান আইনে ১২টি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিধান রয়েছে, যার মধ্যে দুটি অপরাধের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অপরাধ সংঘটিত করার চেষ্টা করার জন্য আছে। এ অবস্থায় এক্ষেত্রে সাজা হিসেবে একমাত্র মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করে অনুরূপ অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি, পরিধি, আসামীর বয়স, অভিপ্রায় এবং অন্যান্য মিটিগেটিং ফ্যাক্টর ইত্যাদি বিবেচনা করে সাজা হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড, প্রয়োজনে জঘন্যতম ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকতে পারে কিন্তু একমাত্র সাজা হিসাবে নয়।

আইন কমিশন পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হলে ১০ সপ্তাহের মধ্যে বা যে সময়ের মধ্যে গর্ভপাত করানো হলে জীবনহানির ভয় থাকবেনা সেই সময়ে গর্ভপাত করানোকে আইনসম্মত করা যেতে পারে। ২০০০ সালের আইনের ১৩ ধারায় বর্ণিত বিধান প্রসঙ্গে দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যু হলে এবং ভবিষ্যৎ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করবে; কিন্তু এইরূপ কোন বৈধ উত্তরাধীকারী বা সম্পদ না থাকলে সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত নারীকে ক্ষতির মাত্রা অনুসারে অর্থ প্রদান করবে। ‘ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা এ-সংক্রান্ত ঘটনা সংবাদ প্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ লিপিবদ্ধ করবেন; এক্ষেত্রে ওই থানার এলাকার মধ্যে ঘটনা সংঘটিত হোক বা না হোক, সেটা মুখ্য নয় এই মর্মে একটি বিধান থাকা প্রয়োজন।

আইন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে ২০০০ সালের আইনে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মেডিকেল চিকিৎসকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হলেও তা আরও সুনির্দিষ্ট এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তা ও চিকিৎসকগণ ক্ষেত্রমত ধর্ষণের শিকার নারীর চিকিৎসা, আলামত সংগ্রহ এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে এজাহার গ্রহণ ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করতে ব্যর্থতার জন্য তারা দায়ী থাকবে এমন বিধান প্রয়োজন।

নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিধান প্রসঙ্গে আইন কমিশন বলেছে, ২০০০ সালের এই আইনের বিচার কার্যক্রমে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধির সীমিত প্রয়োগের পাশাপাশি ১৮৭২ সনের সাক্ষ্য আইনের বিধানাবলী প্রয়োগ হয়। ধর্ষণের আইনে সাক্ষীর সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া একান্ত জরুরি বিষয়। একটি ধর্ষণের শিকার নারী যখন আইনি প্রতিকার চায়, তাকেই সর্বাধিক ঝামেলা পোহাতে হয়। আদালতে তার বিশ্বাসযোগ্যতার মূল্যায়ন করার জন্য তার অতীত যৌন ইতিহাস বা আচার আচরণের উপর ভিত্তি করে প্রায়ই অপরাধের শিকার নারীকে ভাল বা খারাপ ‘চরিত্রের’ উপর জোর দিয়ে আদালতে জনসম্মুখে নিষ্ঠুরভাবে কাটা-ছেঁড়া করা হয় যা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক। শুনানির সময় সাক্ষ্য আইনের ৫৩, ১৪৬ ও ১৫৫ (৪) ধারা অপব্যবহার করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অপরাধের শিকার নারীকে ‘খারাপ মেয়ে’ প্রমাণের চেষ্টা করেন যেন ‘খারাপ মেয়ে’কে যে কেউ ধর্ষণ করতে পারে।

উক্ত বিধান অনুযায়ী, ধর্ষণ বা ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগকারীকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করে তার সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কাঠগড়ায় এসে ধর্ষণের শিকার নারীকে তার সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য যেন তার চরিত্রটি প্রমাণ করতে না হয় তা বিবেচনায় নিতে হবে। একজন ধর্ষিতা নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে সাক্ষ্য আইনের ৫৩ ধারা ও ১৪৬ ধারা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন মামলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ নিষিদ্ধ এবং ১৫৫ (৪) ধারা বাতিল করা বিশেষ প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধের শিকার নারীর সাক্ষ্য অপরাধ প্রমাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কিন্তু প্রায়শই তাকে কুরুচিপূর্ণ, অপমানজনক ও অশ্লীল প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে নারী নির্যাতন দমনে বিদ্যমান আইনের সংস্কারের জন্য আইন কমিশন সরকারকে সুপারিশ করলেও এ বিষয়ে সরকার এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর মধ্যে সম্প্রতি ঢাকার বনানীতে রেইনট্রি হোটেলে দু’জন তরুনীকে ধর্ষণের আলোচিত একটি মামলায় আপন জুয়েলার্সে ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ জন আসামির সবাই খালাস পাওয়ার ঘটনায় নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীরা সাক্ষ্য আইনের বিতর্কিত ধারাটি বাতিলের দাবি আবার সামনে এনেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো আইনের বিতর্কিত ধারাটির কারণে কোন নারী ধর্ষণের অভিযোগ তুললে, সেই নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তাকে দুশ্চরিত্র প্রমাণের সুযোগ রয়েছে।

এ প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ আইনে ধর্ষণের অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার যে ধারা রয়েছে, সেই ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ধারাটি বাতিলের প্রস্তাবসহ আইনের সংশোধনী বিল তারা জানুয়ারি মাসে সংসদের অধিবেশনে উত্থাপন করবেন।

আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, এই ধারা বাতিলের পাশাপাশি আমরা সাক্ষ্য আইনে আরও কিছু বিষয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেজন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন হচ্ছে। সংশোধনী প্রস্তাবগুলো তৈরির জন্য নভেম্বরে সংসদের আসন্ন অধিবেশনে তারা তা উত্থাপন করতে পারছেন না। তারা সংশোধনী বিল জানুয়ারি মাসে সংসদের অধিবেশনে উত্থাপন করবেন।

চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আখতার কবীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ আইনে যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারীকে দুশ্চরিত্র দেখানোর সুযোগ আছে, সেজন্য ধর্ষণের মামলায় তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়া-প্রতিটি ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং আসামীপক্ষের আইনজীবী প্রত্যেকে এই সুযোগ নিয়ে থাকে। আইনের সুযোগ নিয়ে আদালতে ক্ষতিগ্রস্ত নারীকে তার চরিত্র নিয়ে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা এমন সব প্রশ্ন করেন, যা অপমানজনক।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আইনের ক্রুটি, তদন্তের দুর্বলতা ও সাক্ষীর অভাবে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আবার দীর্ঘসময় মামলা চলায় সাক্ষীরা অনেক সময় বেঁকে বসেন। তারা সহযোগিতা করতে চান না। আবার তদন্ত ঠিকমতো না হলে আদালতের সামনে আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না। আবার অনেক সময় আসামির সঙ্গে অভিযোগকারীরা সমঝোতা করে নেন। এটাই বাস্তবতা।’